মুনিরুল তারেক:
চট্টগ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা ইয়াসমীন আক্তার ও তার স্বামী মোশাররফ হোসেন রানা ভুঞার আকাশচুম্বী সম্পদ নিয়ে “এত সম্পদ কোথায় পেলেন চট্টগ্রামের এই দম্পতি?” শিরোনামে প্রথম পর্ব সংবাদ প্রকাশের পর চট্টগ্রামজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। একজন সাধারণ শিক্ষা অফিসারের শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার নেপথ্যে কী জাদু রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন এখন তুঙ্গে। এরই মধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে যে, তাদের এই অবৈধ সম্পদের পাহাড় রক্ষায় এবার প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে তদন্তকারী সংস্থাকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা চলছে।
তবে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঢাকা প্রধান কার্যালয় ও চট্টগ্রাম অফিসের দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করলে তারা বলেন, উপার্জন ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অবশ্যই অনুসন্ধান শুরু করা হবে।
এনবিআর-এর ঝটিকা অভিযান ও রহস্যজনক নীরবতা:
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের একটি বিশেষ দল এই দম্পতির আয়কর নথিপত্র ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব যাচাই-বাছাই করতে মাঠে নামে। সাধারণত এ ধরনের বড় অংকের অসংগতি ধরা পড়লে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও, এই দম্পতির ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন।
অভিযুক্তদের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, এনবিআর-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করা হয়েছে। ফলে সেই তদন্তের অগ্রগতি এখন হিমাগারে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রটি এই দাবির পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেননি। তাই বিষয়টির আরও অধিক ও উচ্চতর তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করে সচেতন মহল।
স্বাভাবিকপ্রশ্ন উঠেছে, যেখানে সাধারণ করদাতাদের সামান্য অসংগতিতে নাজেহাল হতে হয়, সেখানে শত কোটি টাকার অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের মালিকরা কীভাবে পার পেয়ে যাচ্ছেন?
ফেনী থেকে ঢাকা, সম্পদের জাল যতদূর:
প্রথমেই নজরে আসে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর মধ্যজয়পুর এলাকায় গড়ে তোলা ‘রাফান পল্লী’। ৫০ একর জমির ওপর নির্মিত এই রিসোর্টে রয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। পাশাপাশি সেখানে চলছে প্রায় ৩০০ গরুর খামার। এত বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে স্থানীয়রা ইতোমধ্যেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকায়ও রয়েছে একাধিক সম্পদ। পুরাতন থানার ১২ নম্বর সড়কে অবস্থিত ‘রাফান প্যালেস’ ভবন। আরজি ব্লকের পোর্ট কানেকটিং রোডে ৪ কাঠার জমি।
রাজধানী ঢাকায়ও রয়েছে বিলাসবহুল সম্পত্তি। রামপুরায় ‘রাফান টাওয়ার’ নামক ভবন রয়েছে। পাশাপাশি ইস্কাটনে রয়েছে আলিশান ফ্ল্যাটও। শুধু তাই নয়, মিরপুর সেনপাড়া পর্বতায় ৪ কাঠা জমি ২০২২ সালে বিক্রি করেছেন ৬ কোটি টাকায়।
ব্যক্তিগত জীবনে বিলাসিতার কোনো কমতি নেই। পরিবারটির কাছে রয়েছে দুইটি দামী গাড়ি। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মোশারফ হোসেন ভুঞার নামে বাসমতি রেস্টুরেন্টে শেয়ার রয়েছে তাদের। বাড়িতে কর্মরত আছেন প্রায় ২০ জন গৃহকর্মী। শুধু আসবাবপত্রের দিকেই তাকালেও দেখা যায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারা অর্ধকোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয় করেছেন স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে।
প্রভাব খাটিয়ে কি পার পাবেন তারা?
ইয়াসমীন আক্তারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তাদের পারিবারিক প্রেক্ষাপট কখনোই এতটা সচ্ছল ছিল না। গত এক দশকে মূলত সরকারি চাকরির প্রভাব এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। মিরপুর সেনপাড়া পর্বতায় জমি বিক্রি থেকে পাওয়া ৬ কোটি টাকাসহ শত কোটি টাকার লেনদেনের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কেন এখনো নিষ্ক্রিয়, তা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সচেতন মহলে।
অর্থনীতিবিদ ও সুশাসনের জন্য আন্দোলনকারীরা বলছেন, যখন দেশের সাধারণ মানুষ মুদ্রাস্ফীতির চাপে দিশেহারা, তখন একজন শিক্ষা অফিসারের বাড়িতে ২০ জন গৃহকর্মী থাকা এবং কোটি টাকার গাড়ি ব্যবহার করা স্পষ্টতই দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ। এনবিআর বা দুদক যদি সঠিকভাবে তদন্ত না করে, তবে প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
ইয়াসমীন-রানা দম্পতির এই আলাদিনের চেরাগের রহস্য কি তবে অধরাই থেকে যাবে? নাকি উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে থলের বিড়াল?





Add comment