TTB- Voice of Nation

ডিএসসিসি: বিতর্কিত প্রকৌশলী রুবেলকে মারধর করল ঠিকাদার

মুনিরুল তারেক:

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিতর্কিত কর্মকর্তা প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া (রুবেল) মো. কাশেম নামের একজন ঠিকাদার কর্তৃক মারধরের শিকার হয়েছেন। ডিএসসিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, টেন্ডার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খামখেয়ালীপনার কারণে কাশেমের হাতে মার খেয়েছেন তিনি। যদিও প্রকৌশলী রুবেল বলেছেন, ‘আমার সঙ্গে এমন কিছু ঘটেনি। কর্মচারীদের সঙ্গে হট্টগোল হয়েছে।’ তবে প্রশ্ন করলে শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. খালিদ মসনুর মোবাইলে জানান, ‘নগরভবনে প্রকৌশলীকে মারধরের একজনকে আটক করে আনা হয়েছিল। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। মামলা না হওয়ায় আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ গোলাম কিবরিয়া ডিএসসিসি’র সহকারী প্রকৌশলী পদে চাকরি করলেও বর্তমানে মার্কেট নির্মাণ সেলের নির্বাহী প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

একাধিক ঠিকাদার জানান, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মেয়রের পদ শূন্য। বলা যায় গোলাম কিবরিয়া রুবেলই এখন নগর ভবনের সর্বেসর্বা। প্রায় সব শাখার টেন্ডার কার্যক্রম চলে রুবেলের ইশারায়। সেই ধারাবাহিকতায় টেন্ডারের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় রুবেলের সঙ্গে হট্টগোল বাধে ঠিকাদার কাশেমের। গত ২৬ নভেম্বর উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে প্রকৌশলী রুবেলকে নগরভবনের মধ্যেই ব্যাপক প্রহার করেন কাশেম। লোকজন জড়ো হয়ে তাদের ছাড়িয়ে দিলে ইতোমধ্যে খবর পেয়ে শাহবাগ থানা পুলিশ সেখানে যায়। কাশেমকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার অন্য ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমঝোতা হয়। পরে গোলাম কিবরিয়া থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা দায়ের না করার কারণে পুলিশ কাশেমকে ছেড়ে দেয়।

এদিকে, নগর ভবন সূত্র জানিয়েছে, মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস পালিয়ে যাওয়ার পর সরকার প্রশাসক নিয়োগ করেছে। কিন্তু তিনি অফিসে অনিয়মিত। শুধুমাত্র জরুরি স্বাক্ষর প্রয়োজনের ফাইলগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর বাইরে করপোরেশন অনেকটা অভিভাবকহীনভাবে চলছে। এই সুযোগে সাবেক মেয়র তাপসের মেয়াদে পূর্ণ সুবিধাভোগী গোলাম কিবরিয়া ৫ আগস্টের পর থেকে ‘খালি মাঠে গোল’ দেওয়া শুরু করেছেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত তার দাপট ছিল মেয়রপত্নীর আত্মীয় পরিচয়ে। আর এখন তিনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ‘ডিএসসিসি শাখার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে। তার দাপট ও তদবিরে পুরো নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন অতিষ্ঠ। জাতীয়তাবাদী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদকের পরিচয়ে তিনি এখন নগর ভবন নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইতোমধ্যে সহকারী প্রকৌশলীদের থেকে কোন বাছাই কমিটির অনুমোদন বা ছাড়পত্রের অপেক্ষা না করে নিজে নিজেই বাজার সার্কেল মাকেট নির্মাণ সেলের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বলা যায় তিনি যেন পুরো নগর ভবনের অধিকর্তা। পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার সব কিছুতেই তার হস্তক্ষেপ আছে। এমনকি গত সেপ্টেম্বর মাসে তার জোর তদবিরেই সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে যাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তিনি বিএনপির সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলায় সাক্ষী ছিলেন।

ডিএসসিসি’র বিএনপি ঘরানার একাধিক কর্মচারী বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের অন্যতম নায়ক শেখ পরিবারের সদস্য মেয়র তাপসের স্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ে এতোদিন ব্যাপক সুবিধা ভোগ করেছেন গোলাম কিবরিয়া। আওয়ামী লীগের আমলে যেখানে বিএনপির সাথে সামান্যতম সংশ্লিষ্ট পেলেই তাকে নানাভাবে হয়রানি এবং চাকরিচ্যুত পর্যন্ত করা হয়েছে। সেখানে তিনি ওই সময় দিব্যি দাপটের সাথে চাকরি করেছেন, পদোন্নতি পেয়েছেন। আর গত ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি পল্টি দিয়ে আবার জাতীয়তাবাদী লেবাস ধারণ করেছেন। তার এই কর্মকাণ্ডে প্রকৃত জাতীয়তাবাদী যারা এতোদিন সুবিধা বঞ্চিত ছিলেন তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

সূত্র জানায়, গোলাম কিবরিয়া মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সময়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় এখন প্রচার করছেন তিনি বিএনপির লোক। বর্তমানে তিনি সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনের নাম ভাঙিয়ে সিটি কর্পোরেশনে দাপট দেখাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, ধানমন্ডি এলাকায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের একাধিক রেস্টুরেন্ট যেমন ডিঙ্গি, পানসি, সাম্পান এগুলো তিনি অন্যের নামে নিয়ে পরোক্ষভাবে পরিচালনা করছেন।

সকল অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বলেন, এগুলো সব মিথ্যা দাবি, ষড়যন্ত্র। আমি বিএনপির রাজনীতি করার কারণে চাকরি জীবনে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত। রাজনীতি করার কারণে ২০১৪ থেকে ’২০ সাল পর্যন্ত বরখাস্ত ছিলাম। এই সময়ে আমার বিরুদ্ধে ১৮ টির বেশি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। দীর্ঘ ৬ বছর পর চাকরি ফিরে পেলেও বিএনপির লোক হিসেবে ভাল কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি জ্যেষ্ঠতা ভেঙে আমার জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হলেও আমি ছিলাম বঞ্চিত। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সুদিন ফেরত আসায় অনেকে শত্রুতাবশত অপপ্রচার করছে।

পরোক্ষভাবে রেস্টুরেন্ট পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা তো যে কেউ বলতেই পারে। তবে এর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবেন না।

ঠিকাদার কর্তৃক মারধরের বিষয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, আমার সঙ্গে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওই লোক (কাশেম) তো পাগল। তিনি পকেটে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দলীয় ছেলে হিসেবে সবার সুপারিশে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে তাকে।

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.