টিটিবি রিপোর্ট:
দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় কারাদণ্ড হয়েছিল বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজের প্রধান সহকারী মো. জাকির হোসেন মল্লিক ও তার স্ত্রী শাহানাজ হোসেনের। কয়েক মাস কারাভোগের পর জামিন মেলে তাদের। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, পূর্ণ সাজা ভোগ করার পরে অথবা রাষ্ট্রপতির আদেশে সাজা মওকুফ করা হলে চাকরিতে যোগদান করতে পারার কথা। অথচ জাকির হোসেন এসব নিয়মের থোরাই কেয়ার করেন। তিনি মাথার ওপর দণ্ডাদেশ নিয়ে জামিনে কারামুক্ত হয়েই শুরু করেছেন কলেজে যাতায়াত। কাগজে-কলমে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হলেও সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া প্রতিদিনই কলেজে যান, স্বাক্ষর ব্যতিত সকল কাজ করেন। এমনকি প্রধান সহকারীর চেয়ারেও বসেন তিনি। যা চাকরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। যদিও কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর তামান্না বেগম বলেছেন, নতুন যোগদানের পর জাকির হোসেনের বিষয়ে জানতে পেরেই তাকে সকল ধরনের দাপ্তরিক কাজ ও চেয়ারে বসা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৮ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক আ. সালাম আলী মোল্লা জ্ঞাত আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজের প্রধান সহকারী মো. জাকির হোসেন মল্লিক ও তার স্ত্রী শাহানাজ হোসেনের বিরুদ্ধে রমনা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করে একই ব্যক্তি ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর দুই জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। মামলায় বলা হয়, জাকির হোসেন মল্লিকের সহায়তায় স্ত্রী শাহানাজ হোসেন ১৫ লক্ষ ৭৮ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয় বহির্ভুত সম্পদ অর্জন করেন এবং দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১৬ লক্ষ ৪২ হাজার ৩৫৪ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারক আল আসাদ মো. আসাদুজ্জামান দোষী সাব্যস্ত করে মো. জাকির হোসেন মল্লিককে ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে, তার স্ত্রী শাহানাজ হোসেনকে পৃথক দুই ধারায় ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। রায় ঘোষণার সময় জাকির হোসেন মল্লিক ও তার স্ত্রী শাহানাজ হোসেন আদালতে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। জাকির হোসেন মল্লিক ও তার স্ত্রী কয়েক মাস কারাভোগের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান।
সরকারি চাকরি আইন- ২০১৮ এর ৪২ (১) ধারা মোতাবেক কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক এক বছরের অধিক মেয়াদে দণ্ডিত হলে উক্ত দন্ড আরোপের রায় বা আদেশ প্রদানের তারিখ থেকে চাকরি হতে তাৎক্ষনিকভাবে বরখাস্ত হবেন। পূর্ণ সাজা ভোগ না করা পর্যন্ত চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন না।
অভিযোগ উঠেছে, জাকির হোসেন মল্লিক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে জামিনে বের হয়ে নিয়মিত অফিস করছেন। তিনি প্রত্যেক কর্মদিবসে কলেজে উপস্থিত থাকেন। গত ২০ নভেম্বর সকালে সরেজমিনে কলেজে গিয়ে প্রধান সহকারীর কক্ষে অপেক্ষা করার কিছু সময় পর জাকির হোসেন মল্লিক প্রবেশ করেন। তিনি কক্ষে ঢুকেই প্রধান সহকারীর চেয়ারে বসে পড়েন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা শুরু করতেই তিনি কথা বলার জন্য বাইরে ডেকে নিয়ে যান। তখন এই প্রতিবেদক প্রশ্ন করলে জাকির বলেন, ‘আমি তো অফিস করি না।’
‘আপনাকে অফিসে পেলাম, প্রধান সহকারীর চেয়ারে এসে বসলেন’- এই কথা বলতেই তিনি বলেন, ‘আমি তো কলেজে আসতেই পারি। কিন্তু আমি কোনো কাজ করি না। এসে কিছু সময় কাটিয়ে চলে যাই। চেয়ারেও বসি না।’
সূত্র অভিযোগ করেছে, কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সাবিকুন নাহার এবং মাধ্যমিক ও শিক্ষা অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা মো. আল আমিনকে ম্যানেজের মাধ্যমে চাকরিবিধি ভেঙে অফিস করে আসছিলেন জাকির।
সদ্য যোগদান করা অধ্যক্ষ প্রফেসর তামান্না বেগম জানান, ‘আমি যোগদান করে তার বিষয়ে জানতে পেরে নোটিসের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছি তিনি যেন কোনো দাপ্তরিক কাজে অংশ না নেন এবং চেয়ারে না বসতে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। আমার জানা মতে তিনি চেয়ারে বসেন না। যদি চেয়ারে বসেন বা কোনো কাজে অংশ নেন তাহলে পুনরায় নির্দেশ দেওয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, প্রধান সহকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে লোক না থাকায় কাজে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
মন্তব্য জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর এবিএম রেজাউল করীমকে মোবাইলে একাধিকবার কল করলেও রিসিভ না করায় তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
Add comment