TTB- Voice of Nation

‘আপোষহীন নেত্রী’র চিরবিদায়

টিটিবি রিপোর্টা, ঢাকা:

জীবদ্দশায় তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, …এই দেশ, এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষই আমার সবকিছু।’ দেশ-মাটি ও মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা নিবিড় বন্ধন ছিন্ন করে চিরবিদায় নিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায় ভোগা এই আপসহীন নেত্রী গতকাল মঙ্গলবার সকাল ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।

২৩ নভেম্বর শেষ দফায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই কার্যত খালেদা জিয়া জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। এক মাসের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকেরা তাঁর চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গতকাল সকালে চিরবিদায় নেন খালেদা জিয়া। এ সময় বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ভাই-বোনসহ পরিবারের সদস্যরা শয্যাপাশে ছিলেন।

দলীয় প্রধানের মৃত্যুর খবর ‘মহাকালের সমাপ্তি’ শিরোনামে বিএনপি প্রকাশ করে দলের মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে। সাড়ে ছয়টার দিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মুঠোফোনে দলের শীর্ষ নেতাদের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ‘আম্মা আর নেই।’

খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটল গৃহবধূ থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা দ্যুতি ছড়ানো গৌরবময় একটি অধ্যায়ের। তাঁর মৃত্যুর খবরে দেশজুড়ে নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সরকার তাঁর মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং বিএনপি সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আজ বুধবার বেলা দুইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাঁকে শেরেবাংলা নগরে (জিয়া উদ্যান) স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে।

২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর প্রতিদিনই হাসপাতালে মাকে দেখে বাসায় ফিরতেন তারেক রহমান। গত সোমবার বিকেলে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে রাত ১০টার পর এভারকেয়ার হাসপাতালে মাকে দেখতে যান। রাত দুইটায় তারেক রহমান হাসপাতাল থেকে বের হন, তিনটার দিকে গুলশানের বাসায় ফেরেন। তারেক রহমান হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর রাত দুইটার পরপর সংবাদ ব্রিফিং করেন খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের সদস্য ও বিএনপির নেতা এ জেড এম জাহিদ। তিনি জানান, বিএনপির চেয়ারপারসন অত্যন্ত একটি সংকটময় সময় অতিক্রম করছেন।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, রাত চারটার দিকে তারেক রহমানকে খবর দেওয়া হয় যে খালেদা জিয়ার অবস্থা খুবই খারাপ। তখন মাত্র তিনি বিশ্রামে গেছেন। খবর পেয়ে তারেক রহমান স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দ্রুত আবার হাসপাতালে ছুটে যান। একে একে পরিবারের অন্য সদস্যরাও হাসপাতালে পৌঁছান। চিকিৎসকেরাসহ পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়াকে রাখা আইসিইউতেই ছিলেন। ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যসচিব আতিকুর রহমান। তিনি পরিস্থিতির বর্ণনা করে প্রথম আলোকে বলেন, তখন কান্নার রোল পড়ে যায় হাসপাতালের আইসিইউতে। পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন, কান্নায় ভেঙে পড়েন তারেক রহমান।

সকাল আটটায় হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলন করে মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক মহল শোক প্রকাশ করেছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক।

বিএনপির নেতা ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে খালেদা জিয়া প্রায় সংজ্ঞাহীন ছিলেন। মাঝেমধ্যে তাকাতেন, ইশারায় কিছু বলার চেষ্টা করতেন। শেষ দফায় খালেদা জিয়া ৩৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ভর্তির পর প্রথমে তাঁকে কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সিসিইউতে, আরও অবনতি হলে শেষে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সিসিইউতে থাকার সময় একদিন শয্যাপাশে থাকা ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানের সঙ্গে সামান্য কথা বলেন। এরপর ১৯ ডিসেম্বর জুবাইদা রহমান বাংলাদেশ থেকে লন্ডন যাওয়ার সময় বিদায় নিতে গেলে সামান্য মাথা নেড়ে বিদায় দেন।

Add comment