মুনিরুল তারেক, ঢাকা:
চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে ঢাকার ইস্কাটন— সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে তাদের সম্পদের বিস্তার। সরকারি চাকরিজীবী ইয়াসমীন আক্তার ও তার স্বামী মোশাররফ হোসেন রানা ভুঞা মাত্র এক যুগ আগেও সাধারণ পারিবারিক জীবন যাপন করতেন বর্তমানে। তবে বর্তমানে এই দম্পতির সম্পদের পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ইয়াসমীন আক্তার প্রাথমিক শিক্ষার বিভাগীয় উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মরত এবং রানা ভূঞা ২০২২ সালের পর থেকে কোনো চাকরিতে নেই। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, তাদের অর্জিত সম্পদের বেশিরভাগই চাকরিজীবনের বৈধ আয়ের সঙ্গে স্পষ্টতই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে দুদকসহ বিভিন্ন অপরাধ ও দুর্নীতি তদন্তকারী সংস্থার এখনই তাদের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
বিপুল সম্পদের চিত্র:
প্রথমেই নজরে আসে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর মধ্যজয়পুর এলাকায় গড়ে তোলা ‘রাফান পল্লী’। ৫০ একর জমির ওপর নির্মিত এই রিসোর্টে রয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। পাশাপাশি সেখানে চলছে প্রায় ৩০০ গরুর খামার। এত বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে স্থানীয়রা ইতোমধ্যেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকায়ও রয়েছে একাধিক সম্পদ। পুরাতন থানার ১২ নম্বর সড়কে অবস্থিত ‘রাফান প্যালেস’ ভবন। আরজি ব্লকের পোর্ট কানেকটিং রোডে ৪ কাঠার জমি।
রাজধানী ঢাকায়ও রয়েছে বিলাসবহুল সম্পত্তি। রামপুরায় ‘রাফান টাওয়ার’ নামক ভবন রয়েছে। পাশাপাশি ইস্কাটনে রয়েছে আলিশান ফ্ল্যাটও। শুধু তাই নয়, মিরপুর সেনপাড়া পর্বতায় ৪ কাঠা জমি ২০২২ সালে বিক্রি করেছেন ৬ কোটি টাকায়।
ব্যক্তিগত জীবনে বিলাসিতার কোনো কমতি নেই। পরিবারটির কাছে রয়েছে দুইটি দামী গাড়ি। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মোশারফ হোসেন ভুঞার নামে বাসমতি রেস্টুরেন্টে শেয়ার রয়েছে তাদের। বাড়িতে কর্মরত আছেন প্রায় ২০ জন গৃহকর্মী। শুধু আসবাবপত্রের দিকেই তাকালেও দেখা যায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারা অর্ধকোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয় করেছেন স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে।
প্রশ্ন উঠছে— একজন শিক্ষা অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে কীভাবে এত সম্পদ গড়া সম্ভব? দেশের সাধারণ মানুষ যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা ও তার পরিবার কীভাবে শত কোটি টাকার মালিক হলেন, সেটিই এখন জনমনে আলোচনার বিষয়।
বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা:
মোশাররফ হোসেন রানা ভুঞা ২০২২ সাল পর্যন্ত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। এরপর তিনি বেকার। চাকরিজীবনে তার আয় দিয়ে এত বিপুল সম্পদ গড়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে, স্ত্রী ইয়াসমীন আক্তার সরকারি শিক্ষা অফিসার পদে কর্মরত। এই পদে মাসিক বেতন-ভাতা সীমিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে— এই দম্পতির শত কোটি টাকার সম্পদ কোথা থেকে এলো?
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি চাকরি করে এমন সম্পদ অর্জন অস্বাভাবিক এবং স্পষ্টতই আয়-সম্পদের অসামঞ্জস্যতার ইঙ্গিত দেয়। সাধারণ বেতন কাঠামো অনুযায়ী একজন শিক্ষা অফিসারের বৈধ আয় দিয়ে এত বিপুল সম্পদ অর্জনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়সহ একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইয়াসমীনের পারিবারিক অবস্থা ধনাঢ্য ছিল না। আর রানা ভুঞার চাকরির আয় দিয়েও এত সম্পদ সম্ভব নয়। তাদের দাবি— সরকারি চাকরির সুযোগ ও প্রভাব কাজে লাগিয়েই এই সম্পদ অর্জন করা হয়েছে
সাংবাদিককে এড়িয়ে যাওয়া:
তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ইয়াসমীন আক্তারের কাছে সম্পদের ফিরিস্তি তুলে সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন— “আপনি কিভাবে এসব জানলেন?” এসব সম্পদ থাকার বিষয়ে তিনি স্বীকার করে জানান, এগুলোর অধিকাংশই তার স্বামীর মালিকানার সম্পদ। তার স্বামী মোশাররফ হোসেন রানা ভুঞাও ফোন ধরেননি এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকের নাম্বার ব্লক করে দেন।





Add comment