রবিউল ইসলাম
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে নিয়মের বালাই নেই। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে হেড অফিস। সেখানে চলে বহিরাগত, দালাল আর সেবাপ্রার্থীদের মেলা। ভেতরে চলে অনৈতিক সুবিধা লেনদেন আর ডিজিটাল জালিয়াতির মহোৎসব।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই দপ্তরের জুন ২০২৬ মাসের মাসিক সমন্বয় সভার কার্যবিবরণী এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির খতিয়ান। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে নাম এসেছে ৩০তম বিসিএস (ট্রেড ক্যাডার)-এর কর্মকর্তা ও বর্তমান নিয়ন্ত্রক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মাদ মাহমুদুল হক এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী ৩৬তম বিসিএস এর সহকারী নিয়ন্ত্রক (ট্রেড ক্যাডার) মোঃ হাবিবুর রহমান সুমনের বিরুদ্ধে।
গত ০৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ঢাকা দপ্তরের মাসিক সমন্বয় সভার কার্যবিবরণী (নম্বর: ২৬.০৩.২৬০০.০০০.০০১.০৬.০০০১.২৬.১৬৬) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সভায় সরকারি সময়সীমা লংঘন করে রাত ৮টা/৯টা পর্যন্ত অফিস খোলা রাখার বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
কার্যবিবরণীতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ইতঃপূর্বে সহকারী নিয়ন্ত্রক (ট্রেড ক্যাডার) মোঃ হাবিবুর রহমান সুমন ঢাকা দপ্তরে থাকাকালীন সময়ে নির্ধারিত অফিস শেষ হওয়ার পরেও অনেক দেরীতে অফিস ত্যাগ করতেন এবং একই সময়ে যুগ্ম নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক এবং আইটি কনসালট্যান্ট আসাদুজ্জামান রনিকে সাথে নিয়ে রাতভর হেড অফিসে অবস্থান করতেন। অফিস সহায়কদের মাধ্যমে বহিরাগত ও দালালদের অফিসে প্রবেশ করিয়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হতো। হাবিবুর রহমান সুমনকে এ দপ্তর হতে হেড অফিসে বদলী করা হলেও বর্তমানে সে হেড অফিসের মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, নিয়ন্ত্রক (চলতি দায়িত্ব) ও আইটি পার্সন আসাদুজ্জামান রনি সহযোগে রাত ৮টা/৯টা পর্যন্ত অফিসে অবস্থান করে সেবাপ্রার্থী, দালালসহ বিভিন্ন লোকজনকে অফিসে প্রবেশ করিয়ে নানানরকম অনৈতিক সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে যা বিধি বহির্ভুত। একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করার পরও তারা এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যা দপ্তরের ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে।
ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন আমদানি ও রপ্তানি দপ্তরে ‘ওএলএম’ (Online Licensing Module) বা অনলাইন লাইসেন্সিং মডিউল চালু করা হলেও, একেই দুর্নীতির প্রধান হাতিয়ার বানিয়েছে এই চক্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহাম্মাদ মাহমুদুল হক তার বিশ্বস্ত আইটি পার্সন আসাদুজ্জামান রনিকে ব্যবহার করে অনলাইন কারিগরির মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ করেছেন। সম্প্রতি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ওএলএম সিস্টেম থেকে নথি অপসারণ এবং এক চালানের টাকা অন্য আবেদনে ব্যবহার করার মতো মারাত্মক জালিয়াতি ধরা পড়েছে। এই অপরাধে প্রধান নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে আইটি পার্সন আসাদুজ্জামান রনি এবং ঢাকা দপ্তরের উপনিয়ন্ত্রক মোঃ রেজাউল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।
পেপারলেস দপ্তরের দোহাই দিয়ে আইটি সমস্যার কথা বলে দালালদের সরাসরি অফিসে ডেকে আনা হতো। এই ডিজিটাল জালিয়াতি রুখতে সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, রিসেপশন এরিয়া থেকে সমস্ত কম্পিউটার সরিয়ে নেওয়া হবে এবং ডিজিটাল লক ও হাজিরা সিস্টেম চালু করা হবে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সালের ৩ জুন যোগদানের পর থেকে প্রায় ১৪ বছর ধরে একই দপ্তরে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন মোহাম্মাদ মাহমুদুল হক। বিগত সরকারের আমলে তার স্ত্রীর এক নিকটাত্মীয় সংসদ সদস্য থাকায় সেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি অপকর্মের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। দু-একবার ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ও প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় প্রধান কার্যালয়ে ফিরে আসেন তিনি।
শুধু লাইসেন্স (IRC/ERC) বা আইপি-সিপি দেওয়াই নয়, দপ্তরের ১৬-২০তম গ্রেডের নিয়োগ বাণিজ্য ও কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ন্ত্রণ করেও তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘুষ ও জালিয়াতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে মোহাম্মাদ মাহমুদুল হক ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে প্রায় ৪ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক প্লট এবং নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহার করে চাকরিতে প্রবেশের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে।
সমন্বয় সভার রেজুলেশনে এই দুর্নীতির বিষয়গুলো লিখিত আকারে আসার পর সিন্ডিকেটটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, যে সকল সৎ কর্মকর্তা সভায় এই অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন এবং তথ্য উত্থাপন করেছেন, তাদেরকে চাকরিচ্যুত করার এবং প্রশাসনিকভাবে হেনস্তা করার হুমকি দিচ্ছেন মোহাম্মাদ মাহমুদুল হক ও হাবিবুর রহমান সুমন।
বিপাকে দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীরা
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের সার্বিক সংস্কারের হাওয়া বইলেও এই দপ্তরের চিত্র বদলায়নি। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের কারণে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। শিল্প আইআরসি সেবার আবেদন সাবমিট হলেও নথিতে ডকুমেন্ট গায়েব করে দেওয়া হয়, যাতে পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের ডেকে এনে দরকষাকষি করা যায়। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ সমন্বয় সভার সভাপতি ও নিয়ন্ত্রক মাসুদুল মান্নান স্বাক্ষরিত কার্যবিবরণী অনুযায়ী, দপ্তরের শৃঙ্খলা ফেরাতে ইতোমধ্যে সাময়িকভাবে লিফটের সামনে স্থাপিত বিতর্কিত কিচেন ও ডাইনিং যেখানে বহিরাগতদের আড্ডা চলতো বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মহলের দাবি, এই স্বৈরাচারের দোসর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অনতিবিলম্বে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মাধ্যমে তাদের অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক।